আজ আমরা গর্বের সঙ্গে বলি—“আজ স্বাধীন বাংলাদেশ”। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে:
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির সময় যদি পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের সঙ্গে না গিয়ে ভারতের সঙ্গেই থেকে যেত, পশ্চিমবঙ্গের মতো—তাহলে কি আজ আমরা ‘স্বাধীন বাংলা’ বলতে পারতাম?
১৯৪৭ সালের বিভাজন ও পূর্ববঙ্গের সিদ্ধান্ত
১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে পূর্ববঙ্গ যুক্ত হয় পাকিস্তানের সঙ্গে এবং নাম পায় পূর্ব পাকিস্তান। সে সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, একই ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রে বাঙালির অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
রাষ্ট্রক্ষমতা, অর্থনীতি, সেনাবাহিনী ও প্রশাসন—সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমেই প্রকট হতে থাকে।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে দেয়—রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নেই বাঙালির অস্তিত্ব সংকটে। এরপর ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়।
ফলাফল—১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, বাংলাদেশ।
যদি পূর্ববঙ্গ ভারতের সঙ্গে থাকত?
এই প্রশ্নটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গ আজও ভারতের একটি রাজ্য, আলাদা কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নয়
কাশ্মীর আজও একটি বিতর্কিত অঞ্চল, যেখানে পূর্ণ স্বাধীনতা নেই
ভারতের ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে থেকে কোনো রাজ্য স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি
এই বাস্তবতা বিবেচনায় বলা যায়,
👉 পূর্ববঙ্গ যদি ভারতের অংশ হতো, তাহলে ‘স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা প্রায় থাকত না।
কাশ্মীর ও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বাস্তবতা
কাশ্মীর আজও সংঘাত, সামরিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গ সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেও রাজনৈতিকভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীন।
এই উদাহরণগুলো স্পষ্ট করে—
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব পাওয়ার পথটি পূর্ববঙ্গের জন্য পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই সম্ভব হয়েছে।
উপসংহার
ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত বাঙালির জন্য বেদনাদায়ক হলেও, সেই পথ ধরেই এসেছে ভাষা আন্দোলন, জাতীয় চেতনা এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা।
অতএব বলা যায়—
পূর্ববঙ্গ যদি ১৯৪৭ সালে ভারতের সঙ্গে থাকত, তবে আজ ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ নয়, হয়তো একটি রাজ্যের নাম হিসেবেই ‘বাংলা’ সীমাবদ্ধ থাকত।
স্বাধীনতা এসেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, আর সেই সংগ্রামই বাঙালিকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মো: জাহিদ হাসান
গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মী

